1. mdrahim191420@gmail.com : Tazu Miazi : Tazu Miazi
  2. admin@www.bangladeshbartabd.com : Bangladeshbarta :
শরৎ আছে শরৎ নেই - Bangladesh Barta
বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন

শরৎ আছে শরৎ নেই

বীরেন মুখার্জী
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১
  • ৪১ বার পড়া হয়েছে
মাঝরাতে বৃষ্টির মাঝারি সেতারে বেশ সুরেলা গান হলো। ঘুমপাড়ানি গান। বৃষ্টির নূপুর থেমে যেতেই চারদিকে সতেজ হাওয়া। ভেজাগন্ধে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবনার ভেতর এলিয়ে পড়লাম বিছানায়। চোখে রাজ্যের ঘুম। ঘুমের ঘোরেই কামিনীর মৃদু গন্ধ অনুভূত হলো। চোখ খুলে দেখি ভোরের পৃথিবীতে পাখা মেলেছে কাচরোদ। কতক্ষণ নিদ্রায় ডুবে ছিলাম এখন তা আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে চোখের সামনে বিস্তৃত আকাশের নীলভাঙা দোপাট্টা জুড়ে সাদা মেঘের খুনসুটি। এলোমেলো মেঘের তাথৈ। ওদিকে পাপড়ি ঝরিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমার ছোট্ট কামিনী গাছ। গাছটিকে টেবিল দূরত্বে জানালার পাশে রেখেছিলাম। কয়েকদিন আগে দেখেছি থোকা চারেক কলি এসেছে গাছে। আমি দুহাতে কামিনীর ঝরা পাপড়ি স্পর্শ করে টের পেলাম এখনও মৃদু সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। রাতে ফুটে প্রভাতে ঝরে যাওয়া শুভ্র কামিনী শরতেরই ফুল। সকালের এমন দৃশ্যে মনে হলো
প্রকৃতিতে নিশ্চয় শরৎ এসেছে। কামিনী আর আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়তে থাকে গীতবিতানের কথা, রবি ঠাকুরের বাণীÑ ‘আমার রাত পোহাল শারদ প্রাতে/ বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে।’ যদিও করোনাকালে ঘরবন্দি, তাই বলে প্রকৃতি তো তার বাহারি ডালি সাজানো বন্ধ করবে না!
পঞ্জিকার শেষদিন পেরিয়ে এসেছে বর্ষাঋতু। এখন শরৎকাল। তবে এখনও আকাশে মেঘের ঘন-আয়োজন শেষ হয়নি। খাল-বিল-নদী জলে থৈ থৈ। নদীর তীর, বিল আর খোলা-পতিত প্রান্তরে মাথা তুলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে পোয়াতি কাশবন। কিছুদিনের মধ্যেই রূপ-ঐশ^র্যে বিকশিত হবে তার পূর্ণ যৌবন। এমন দিনে শৈশবের কথা খুব মনে পড়ে আমার। মনে পড়ে শরৎ-সংহিতায় নাম না জানা অজস্র মাঠফুলে আত্মমগ্ন থাকার স্মৃতি। শরতের রূপে শুধু মেঘ, আকাশ, চর, কাশবন, বাহারি ফুল কিংবা ছলছল জলতরঙ্গে বয়ে যাওয়া নদীদৃশ্যই নয়, শরতের সতেজ মোহনীয় রূপবৈভবে বাঙালির প্রাণের অস্তিত্বও ফুটে ওঠে। মাঠভরা সবুজের ডালি সাজিয়ে, আকাশে-বাতাসে মুক্তির উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে শরৎ যেন ঘোষণা করে তার ঐশ^র্য! তখন প্রাণে-প্রাণে শরৎ ধরা দেয় জন্মভূমির রূপসী মানসকন্যারূপে। তার দিগন্তজোড়া মিহিরূপের সৌন্দর্যে উদাসী হয়ে ভেসে যেতে ইচ্ছে করে সকল প্রাণের।
যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা প্রকৃতি বর্ণনায় শরৎকালকে এগিয়ে রেখেছেন। শরৎ বন্দনায় পঞ্চমুখ থেকেছেন শব্দভাষ্যে। শারদসম্ভার নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম কবির রচনায়ও শরৎকাল তার নান্দনিক ব্যঞ্জনা নিয়ে উদ্ভাসিত। মহাকবি কালিদাস ‘মেঘদূত’ কাব্যে মেঘের খামে পুরে প্রিয়ার কাছে চিঠি পাঠানোর কথা বলে বিখ্যাত হয়ে আছেন। শুধু মেঘই নয়, কালিদাস শরৎ বন্দনায়ও ছিলেন অগ্রবর্তী। তিনি বলেছেন, ‘প্রিয়তম আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নববধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত।’ ‘ঋতুসংহার’ কাব্যে শরৎকাল বিষয়ে লিখেছেন, ‘কাশফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালিধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নববধূর মতো শরৎকাল আসে।’ কবি কল্পনায় কী দারুণ শরৎ-পরিবেশনা! শরতের সঙ্গে প্রকৃতি ও নারীর এই উপমা দেখে বিস্ময়াভিভূত না হয়ে উপায় কী? চ-ীদাস তার কবিতায় বলেছেন, ‘ভাদর মাঁসে অহোনিশি আন্ধকারে/ শিখি ভেক ডাহুক করে কোলাহল।/ তাত না দেখিবেঁট যঁবে কাহ্নাঁঞির মুখ/ চিনিতে মোর ফুট জায়িবে বুক।’ চ-ীদাস ‘শিখি’ বলতে ‘ময়ূর’, ‘ভেক’ অর্থে ‘ব্যাঙ’ ও ‘ডাহুক’ পাখির কোলাহল শোনা যায় বলে উল্লেখ করেছেন।
ভাদ্র-আশ্বিন দুই মাস শরৎকাল। এই ঋতুতে বাংলার প্রকৃতিজুড়ে শোভা ছড়ায় ছাতিম, বরই, দোলনচাঁপা, পবলি, শিউলি, শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জরি, শ্বেততকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, ধুতরা, কল্কে, স্থলপদ্ম, সন্ধ্যামণি, ঝিঙে, জয়ন্তী, কাশফুলসহ নাম না জানা অজস্র ফুল। তবে নিশ্চিতরূপেই বলা যায়, সফেদ কাশফুলই শরতের আগমনের পূর্ণাঙ্গ প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘দুই ধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।’ সাদা কাশফুলের ভেতর দিয়ে ঝকঝকে নীলাকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি দেখে প্রকৃতিপ্রেমীরা অভিভূত না হয়ে পারেন না। শরতের আরও একটি প্রতীক শিউলি। শিউলি ফোটে শরতের নির্জন রাতে এবং মন উদাস করা মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে ভোরের শিশির মেখে ঝরে পড়ে সূর্য ওঠার আগেই। শিউলি ফুলের অপূর্ব মহিমা বর্ণিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যে। কাজী নজরুল ইসলামও লিখেছেন, ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ।’ প্রেম-দ্রোহের কবি খ্যাত নজরুল আরও লিখেছেন, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে।/ এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে।’ বাংলার সহস্র কবি-সাহিত্যিকের বন্দনায়ও নানানভাবে উঠে এসেছে শরতের রূপবৈভব।
অনেকে মনে করেন, ঋতুরাজ বসন্তের অভাব পূরণে সৌন্দর্য বিলাতে হাজির হয় ঋতুরানী শরৎ। অনুপম রূপ সৌন্দর্যম-িত শরৎ ঋতু শারদ লক্ষ্মী নামেও পরিচিত। শরৎকালের মধ্যেই যেন বাংলাদেশের হৃদয়ের স্পর্শ মেলে। শরতে প্রিয়জনের হাত ধরে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে কার না সাধ জাগে। রবীন্দ্রনাথের এই রচনাটিই যার উৎকৃষ্ট প্রমাণÑ ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়/ লুকোচুরির খেলা।/ নীল আকাশে কে ভাসালে/ সাদা মেঘের ভেলা।’ শরৎ যেমন প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় তেমনি সংস্কৃতিতেও ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে মানুষের ক্লান্তি মোচনের ক্ষেত্র তৈরি করে। শরৎ অবসাদগ্রস্ত মনে নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। শরতের কাশবন আর জ্যোৎস্নায় প্রিয়জন সান্নিধ্যে হারিয়ে যাওয়ার বাসনা প্রবল হয়, শত কষ্ট গোপন করেও। শরতের প্রকৃতির মতোই চঞ্চল হয়ে ওঠে মন। যে মন কখনও সন্ন্যাসী, কখনও অভিমানী। কখনও নিষ্প্রভ আবার কখনও বা ভাবুক। প্রকৃতির রঙে মিশিয়ে মনের এই পরিবর্তনের ছবি আঁকতে চান শিল্পস্রষ্টা। শরতে নতুন ধান আর পাখির কূজনে মুখরিত বাংলার মাঠ-ঘাট জনপদ।
প্রতি শরতে যাযাবর হয়ে ওঠে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি-নদী। মাঠভরা ফসলের সুরেলা সবুজ ছুঁয়ে উঠে আসে স্মৃতিবিনাশী হেম। মন খারাপের কিশোরবেলা ঘিরে চোখে নাচে অথৈ সমুদ্র। বুকের খুব কাছে থিতু হয়ে থাকে প্রিয় কিছু হাহাকার। সম্পর্কের সুতোয় গাঁথা প্রথম চুম্বনরেখা ধরে হাঁটতে থাকে অনপনেয় বাৎসল্য। শিশিরভেজা শিউলি ছুঁয়ে জমতে থাকে কিছু প্রাগ্হেমন্তের হলুদাভ মায়া। প্রতিমুহূর্তে আকাক্সক্ষার নীলিমায় জেগে ওঠে এক নামের মহিমা। শরতের এমন স্নিগ্ধ-শান্ত মৌসুম, এত সবুজ, নীল আর সাদার মিলনে মন কেমন করা অনুভূতিতে ‘তুমি’ ছাড়া আর কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। কেননা, আমি জানি নরম আলো-আঁধারে নির্ভেজাল মনোজটিলতার আরেক নাম শরৎ। তাই সময়ের ঘুঙুরে সাজাই অক্ষরের বিপুল পরিক্রমা। বিভ্রান্ত এই সময়, মারিকাল যতই ঘরবন্দি রাখুক দেহ, দূরত্বের সীমা পেরিয়ে যেতে এই মন উড়ন্ত মেঘে ভাসিয়ে দিই। আর হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারণ করিÑ ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি/ ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি/ শরৎ, তোমার শিশির-ধোয়া কুন্তলে/ বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে/ আজ প্রভাতের হৃদয় উঠে চঞ্চলি।’ যদিও কংক্রিটের এই শহরে, যান্ত্রিক-দূষণ নগরীর দর-দালানের ভিড় ঠেলে
প্রকৃতিতে শরৎ কতটুকু শোভা বিস্তার করেছে তা বোঝারও যথেষ্ট অবকাশ নেই।

সংবাদটি শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত  দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা  ২০২০-২১
এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও ব্যবহার বেআইনি

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট