1. mdrahim191420@gmail.com : Tazu Miazi : Tazu Miazi
  2. admin@www.bangladeshbartabd.com : Bangladeshbarta :
শরতের গল্প - Bangladesh Barta
বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

শরতের গল্প

ফারহানা রহমান
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১
  • ৪৭ বার পড়া হয়েছে
তুমি চলেই গেলে অবশেষে। অবশ্য মনেপ্রাণেই চাইতাম তুমি চলে যাও। তোমার নিথর ঠান্ডা দেহটার সামনে এই মুহূর্তে যুগপৎ ক্লান্তি আর স্বস্তি নিয়ে বসে আছি। কী শীতল আর স্থির তুমি শুয়ে। আমার সামনেই যেন ক্রমশ তুমি থেকে তুমিহীন হয়ে আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছ। একটা সাদা কাপড় আপাদমস্তক তোমায় ঢেকে রেখেছে বলে মুহূর্তেই তুমি শিউলি থেকে ডেডবডি হয়ে গেলে। চারদিকে ভিড়, মেকি কান্না, উপচে পড়া নাগরিক শোক আমাকে আরও একা করে দিচ্ছিল।
কী অদ্ভুত ভাগ্য তোমার! মরেও নিজের ইচ্ছেটুকু খাটাতে পারলে না। টানা তিন বছর ক্যানসারের সাথে যুদ্ধ করেছ। তোমার অতিব্যস্ত ছেলে আর ছেলের বউয়ের সময় হয়নি একবার দেখে যাবার। কিন্তু যেই মরে গেলে অমনি শেষ দেখার মঞ্চে তাদের আগমন; যেন মৃতমুখটা দেখলেই তাবৎ দায়িত্ব ষোলকলায় পূর্ণ হবে। মাঝে মাঝে সব গুলিয়ে যায় জানো! মাকে কতটা ভালোবাসছি এই নাটুকে কান্না সমাজকে দেখাতে হাজার মাইল পথ উড়ে চলে আসতে পারে অথচ বেঁচে থাকা মায়ের মুখটা একবারও দেখতে ইচ্ছে করেনি ওদের।
* কতবার করে বললাম আমায় নিয়ে লেখ্। অন্তত তোর গল্পে তো থাকি!
খাটিয়ার রডে মাথা রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি! চোখ কচলে ধরমর করে মাথা তুললাম, ‘ওমা! তুমি উঠে বসলে! কী করে? মৃতদের তো নড়াচড়ার নিয়ম নেই।’
* আর নিয়ম। বেঁচে থেকেও তো মরার মতোই ছিলাম। ওটাও কি নিয়মের মধ্যে পড়ে, বল? ভাবলাম খোকন না আসা পর্যন্ত তো সেই হিমশীতল বাক্সে ভরে রেখে দেবে। থাকতে যে পারতাম না, তা নয়। ওরকম ছোট জায়গা ম্যানেজ করে জীবন পার করার ঢের অভ্যেস আছে। এখন তো মৃত। আর মৃতের স্বাধীনতায় কেউ নিশ্চয়ই বিরক্ত বা বিব্রত হবে না। তাই ভাবলাম অমন গুমোট জায়গায় থাকার চেয়ে সময়টা তোর সাথে গল্প করে কাটাই। চল ছাদে যাই। আজ পূর্ণিমা। জানিস?
* তুমি সন্ধ্যা থেকে যে ছ্যাড়াব্যাড়া লাগালে তাতে আর জোছনা দেখলাম কখন?
* তাও ঠিক। আমার হাতে তো কিছু ছিল না। কম তো যুদ্ধ করিনি। বেঁচে থাকবার যে ইচ্ছে ছিল না তেমন, সে তো জানিসই। তবু শেষের দিকে খোকনকে খুব দেখতে ইচ্ছে করত। দশ বাই বারো ফুটের ছোট্ট কেবিনটাতে স্মৃতিগুলো ধাক্কাধাক্কি করে সামনে হেঁটে বেড়াত। প্রথমদিকে তাড়াতে চাইতাম। পারতাম না। পরে ভাবলাম কেউ যখন আসে না তবু ওরা আসুক। যন্ত্রণা ভুলে থাকার এও এক চেষ্টা। তুই যখন আসতি, ক্ষণিকের জন্যে সবকিছু ভুলে যেতাম। জানিস, এক জীবনে আমাকে কোন কথাটি সবচেয়ে বেশি বলতে হয়েছে? ‘তোমরা যা ভালো বোঝো করো।’ আর কোন কথাটি সবচেয়ে বেশি শুনতে হয়েছে? ‘একটু ম্যানেজ করে চলো না।’ সারাটা জীবন ম্যানেজ করে আর অন্যের ইচ্ছেতেই চলতে হলো। মরে গিয়েও তাই চলছি।
* হু। তোমার ইচ্ছের কথা আমি জানিয়েছিলাম তোমার মেয়ে, জামাই, ভাই-বোন আর তোমার ছেলেকে। কারও জন্যে অপেক্ষা না করে খুব দ্রুত যেন তোমাকে শুইয়ে দেওয়া হয় চিরস্থায়ী আবাসে। আমার কথা কেউ শুনলে তো! তোমার চেয়ে এখন খোকনের ইচ্ছের মূল্যায়নে ওদের ফায়দা বেশি।
* ঠিক তাই। তাকিয়ে দেখ, আমার মেয়েটার চোখেমুখে কী স্বস্তি। অসুস্থ মাকে দেখতে না আসার নানাবিধ অজুহাত আর খুঁজতে হবে না।
* হ্যাঁ, ও আর দেখাতে হবে না। মনে মনে কিন্তু খুব রেগে আছে এমন অসময়ে মরলে কেন। তার বেবিদের এক্সাম চলছে। মেন্টালি একটা ধাক্কা দিলে। আর কদিন পর মরলে কী হতো?
* সত্যিই! সারাটা জীবন অসময়েই সব করে গেলাম। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। কত রকম হ্যাপা, বল তো! সেবার ওদের দেখার জন্যে মনটা খুব ছুটছিল। নিজেকে বেঁধে রাখলাম স্কুল ছুটির আশায়। ছুটি হতেই পছন্দের সব খাবার বানিয়ে দেখতে গেলাম। দেখেই মেয়ে আর জামাইয়ের মুখ কালো হয়ে গেল। অভিমান পাত্তা দেইনি নাতিনাতনি দুটির আনন্দিত মুখ দেখে। সন্ধে নাগাদ যখন জানতে চাইল কদিন থাকব, তখন খুব কষ্টে নিজেকে সামলেছিলাম। বড্ড অসময়ে এসেছি। ওরা ছুটিটা বেড়িয়ে কাটাবে ভেবেছে। এসে ওদের প্ল্যান মাটি করে দিলাম। অবশ্য পরদিন সকালেই চলে এলে ওরা বেশ স্বস্তি পেয়েছিল।
* তুমি কি সত্যিই পরদিন সকালে চলে আসতে চাইছিলে?
* হু।
* মিথ্যে বলো কেন? সব ভুলে গেছি, ভাবছ? সাত দিন ধরে জ্বালিয়ে মারলে। আজ বিন্নিধান এনে দে, কাল নারিকেল এনে দে। পদ্মার ইলিশ এনেছিস তো এবার দেশি মুরগি এনে দে। তোর হাতে মমটা ভালো হয়। একদিন বানিয়ে দিয়ে যা। তোমার ছোট নাতনির পছন্দ। আরও কীসব হিজিবিজি রান্না। যাবার আগের দিন আবার ডাকলে, মনে নেই তোমার?
* বাদ দে না। ওসব ভুলে যা তো…
* তা তো বলবেই। শুনতে খারাপ লাগছে বুঝি? আর এই যে বললে মনে নেই এও আরেক মিথ্যে। মরে গিয়েও ছেলেমেয়ের সম্মানের কথা ভাবছ? হায়রে!
* এ ঠিক মিথ্যে বা সম্মানের দিকটা নয় রে। তুইও তো মা। সন্তানের প্রতি কটু কথা সত্যি হলেও সইতে পারবি?
* ওসব বুঝি না তো। রাগ কমানোরও কোনো জায়গা রাখছ না। মেয়ের বাড়িতে যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় ডাকলে। দুজন মিলে শপিং করলাম তোমার মেয়ে, জামাই, নাতিনাতনির জন্যে। কেনাকাটা শেষে বেরুবার আগে আস্তে করে বললে, ‘সাধনা, দেখ না ওই অফ হোয়াইট শাড়িটা, ন’শ টাকায় দেবে কি না। দেখ তো একটু।’ আগেই বুঝেছিলাম শাড়িটা তোমার পছন্দ। কিন্তু কেনাকাটায় টাকা কম পড়ার ভয়ে আগে বললে না। শাড়িটা বারো শ টাকায় কিনে তোমার হাতে তুলে দিলাম।
* ও মা! তুই বলেছিলি শাড়িটা ন’শ টাকায় দিয়েছে।
* মিথ্যে বলেছি। তুমি আমার কাছ থেকে টাকা নিতে না তাই। তোমার কাছে এক হাজার টাকার একটা নোট ছিল শুধু। আমি দেখিনি ভেবেছ?
* তাই বলে মিথ্যে বলবি?
* ওসব কথা রাখো তো। তার চেয়ে তোমার কথা বলো। শাড়িটা পরেছিলে? এত শখ করে নিলে।
* পরেছিলাম। মেয়ের বাসা থেকে যেদিন ফিরে এলাম সেদিন। অবশ্য যাবার দিনও পরেছিলাম। নতুন বলতে তো ওই একটাই শাড়ি ছিল। তোকে কি বলেছিলাম ওদের ওখান থেকে ফিরে আসবার দিনটার কথা?
* না তো। কী হয়েছিল বল তো!
* বাদ দে তা হলে। ওসব শুনে কাজ নেই। কষ্ট পাবি।
* আরে বলো না কী হয়েছিল? এখন শুনলেই কী আর জানলেই কী? তোমাকেও কেউ চোখ রাঙানি দিতে আসছে না আর আমি তো এদের ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ি না।
* দৃশ্যগুলো সব মনে পড়ে গেল তো তাই। কাউকে বলিনি জানিস। তোকেই প্রথম বলছি। আসবার সময় ওদের গাড়ি স্টেশনে পৌঁছে দিতে এসেছিল। মনে হচ্ছে এখন, কেন সেদিন ওদের গাড়িতে উঠেছিলাম। না উঠলে এমন নির্মম সত্যিটা দেখতে হতো না। এমন বিশ্রী হৃদয়ভাঙা ঘটনার সাক্ষীও হতে হতো না।
স্টেশনে পৌঁছে গাড়ির পেছন থেকে ব্যাগ নামাতে গিয়ে দেখি ওদের জন্যে বানিয়ে নেয়া পিঠার প্যাকেটটা ওখানে পড়ে আছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘মেমসাহেবরে কে নাকি দিছে এইগুলা। সাহেবের কোলেস্টেরল বাইড়া গেছে। বাচ্চারাও খাইতে চায় না এইসব তেউল্লা পিডা। এইগুলা খাইলে তিনারা মোটা হই যাইবেন তাই আমাগোরে দিয়া দিছেন ভাগ কইরা খাইতে।’ ড্রাইভার আরও কী যেন বলছিল, ওসব আর কানে আসছিল না। সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল তখন। তড়িঘড়ি করে ট্রেনে উঠলাম। উঠে বসতেই মনে হলো এ শহর থেকে যত দ্রুত পালানো যায় ততই মঙ্গল। কেমন এক লজ্জায়, অস্বস্তিতে গুটিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি একটা সার্কাসের প্রাণী। প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা ভিখিরি, হকার, যাত্রী, দোকানদার থেকে ওভারব্রিজ, চায়ের দোকানের ফুটন্ত কেটলি, রেললাইন, এমনকি বিদ্যুতের খুঁটির সাথে ঝুলন্ত মরা কাকটাও আমাকে উপহাস করছে। ক্রমাগত অসহনীয় এইসব উপহাস আমাকে এতটাই গুটিয়ে ফেলছিল যে আমি আর আমি রইলাম না। নিজেকে প্ল্যাটফর্মের ধুলোময়লার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে হতে লাগল। সেই প্রথম বুঝতে পারলাম আমি কতটা অপ্রয়োজনীয়। আরে! তোর চোখে জল কেন? জাগতিক শাস্তির মেয়াদ তো আমার শেষ। এখন মুক্তি। যা কিছু কষ্ট সে তো আমি বেঁচে থেকেই পেয়েছি রে। মরে যাবার সুখে একটাই হাহাকার, তোকে খুব মনে পড়বে। অনেক জ্বালিয়েছি তোকে। সময়ে-অসময়ে। দেখ দেখ, ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। প্রিয় গানটা শেষবারের মতো শোনাবি রে?
আকাশের দিকে তাকালাম। অজস্র তারা মিটমিট করে জ্বলছে। শরতের এই আকাশ আমার চেনা। আধো অন্ধকারে দূরে ফুটে থাকা শে^তকাঞ্চন বা মধুমঞ্জরিকে যেমন রহস্যময় রূপবতী লাগে অথবা শিউলির গায়ে জমা শিশিরকে যেমন আদুরে লাগে; আকাশটা ঠিক তেমনি। মা-বাবা ওই আকাশে তারাদের ভিড়ে হারাবার পর ছোট খালাকে মনে হতো ওদের কাছাকাছি পৌঁছানোর সিঁড়ি। মায়ের ছায়া খুঁজে পেতাম তার মধ্যে। আজ সেই সিঁড়িটা, সেই ছায়াটাও হারিয়ে গেল। আপনজনেরা আমায় একা করে এখন অন্য ভুবনে। আর এ ভুবনে যারা তারা কি সত্যিই কেউ আপন আমার? এ হিসেব বড্ড গোলমেলে। কাঁধে একটা মৃদু স্পর্শে চমকে গেলাম। তাকিয়ে পাশে কাউকেই পেলাম না। ছাদের ধার ঘেঁষে বেড়ে ওঠা শিউলি গাছটার কিছু ঝরা শিউলি আমার মাথায় আর কাঁধে যেন স্নেহের পরশ বুলাচ্ছে আর কয়েক ফোঁটা শিশির আমার চোখের কোল ঘেঁষে…
আমি গাইতে থাকলাম…
‘অমল ধবল পালে লেগেছে
মন্দ মধুর হাওয়া।
দেখি নাই কভু দেখি নাই
এমন তরণী বাওয়া…’

সংবাদটি শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত  দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা  ২০২০-২১
এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও ব্যবহার বেআইনি

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট